রাজিবপুরে সরকারি পুকুর ভরাট করে অবৈধ স্হাপনা নির্মাণের অভিযোগ

কুড়িগ্রামের রাজিবপুরে সরকারি পুকুর ভরাট করে অবৈধ স্হাপনা নির্মাণের অভিযোগ।

মোবাশ্বের নেছারী কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:

কুড়িগ্রামের রাজিবপুর উপজেলায় ভূমি কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ মদদে সরকারি পুকুর ভরাট ও দখল করে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। মাছ চাষের জন্য পুকুর লিজ নিলেও এর শর্ত ভঙ্গ করে ‘ভূমির শ্রেণি’ পরিবর্তন করে দখলে নিয়েছেন ওসিউজ্জামান নামে বিএনপি’র এক নেতা।

রাজিবপুর উপজেলা চত্বর সংলগ্ন শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়ামের পূর্বপাশের ঘটনা এটি। সরকারি এ পুকুরটি দ্রুত দখলমুক্তসহ রক্ষার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

২০২২সালের ৪ ডিসেম্বর (রোববার) সরকারি এ সম্পত্তি উদ্ধারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দেন উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সাত্তার জিহাদী। তবে অভিযোগ উঠেছে, সরকারি এ সম্পত্তি রক্ষায় দায়িত্বশীলরা উদাসীন।

খোদ ভূমি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁদের সহায়তায় দখল হচ্ছে সরকারের কোটি টাকা মূল্যের এ পুকুরটি। ওসিউজ্জামান উপজেলার সদর ইউনিয়নের আজগর দেওয়ানী পাড়া গ্রামের মৃত কেরামত আলীর ছেলে। তিনি রাজিবপুর সদর ইউনিয়নের ৮নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি’র সভাপতি।

জানা গেছে, বাংলা ২৪২৭ থেকে ২৪২৯ সালের ৩০ শে চৈত্র পর্যন্ত (তিন বছরের জন্য) পুকুরটি মাছ চাষের জন্য উপজেলা পরিষদ থেকে লিজ নেন বিএনপি নেতা ওসিউজ্জামান। এতে ইজারা মূল্য ধরা হয় ৯লাখ ৬০হাজার টাকা। লিজের তফশিলে বলা আছে, চর রাজিবপুর মৌজার জেএল নম্বর-২৪, আরএস খতিয়ান নম্বর-১১ এর ৯৫৪২/৯৬৩২ দাগে ২ একর ২৭শতাংশ জমি রয়েছে।

লিজের চুক্তিনামার ১৩নম্বর শর্তে বলা আছে,‘ইজারা ভোগকালীন সময়ে পুকুরের চৌহর্দ্দি ও আকার-সীমানার কোনো পরিবর্তন করা যাবে না।’ তবে এ শর্তের কোনো তোয়াক্কা না করে লিজ গ্রহীতা ওসিউজ্জামান ওই পুকুরের অর্ধেক জায়গায় মাটি ফেলে ভরাট করে দখলসহ স্থাপনা নির্মাণ করেন।

রাজিবপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সাত্তার জিহাদী অভিযোগ করে বলেন, সার্ভেয়ার আব্দুল আউয়াল ও ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা আব্দুস সালাম মন্ডলসহ একটি প্রভাবশালী মহলের প্রত্যক্ষ মদদে অবৈধভাবে এ পুকুরটি ভরাট করে দোকানঘর নির্মাণ করেছেন বিএনপি নেতা ওসিউজ্জামান।

তিনি অভিযোগ বলেন, সরকারি সম্পত্তি উদ্ধারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিলেও কোনো প্রতিকার মিলেনি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, উপজেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত সরকারি এ পুকুরটি মাছ চাষের জন্য দীর্ঘ দিন ধরে লিজ দিয়ে আসছে উপজেলা পরিষদ। চুক্তিনামা ভঙ্গ করে ‘ভূমির শ্রেণি’ পরিবর্তন করে ড্রেজার দিয়ে মাটি ভরাট করেন ওসিউজ্জামান নামের বিএনপির এক নেতা।

নির্মাণ করেন দোকান ঘর। এতে সরকারি সম্পদ হাত ছাড়া হওয়ার পাশাপাশি নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় ও প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে কোটি টাকা মূল্যের সরকারি এ পুকুরটি দখল হয়ে যাচ্ছে। প্রভাবশালীদের কব্জা থেকে দ্রুত সরকারি এ পুকুরটি উদ্ধারে উপর মহলের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তাঁরা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলা চত্বর লাগুয়া শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়ামের সাথেই লাগুয়া সরকারি এ পুকুরটি। এর উত্তর পাশে (রাস্তা সংলগ্ন) পুকুরের অর্ধেক জায়গায় মাটি ফেলে ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছে সারি সারি রঙ্গীন টিনের ঘর।

লিজ নিয়ে পুকুর ভরাটসহ স্থাপনা নির্মাণের কথা স্বীকার করেন বিএনপি নেতা ওসিউজ্জামান। তিনি বলেন, লিজ নিলেও ওই পুকুরে তাঁর ১একর ১৩শতক জমি রয়েছে। এর মধ্যে ৮৩শতক জমিতে মাটি ফেলে ভরাটসহ দোকানঘর নির্মাণ করছেন তিনি। তাঁর দাবি, ভূমি অফিসের লোকজন এসে এ জমি মেপে দিয়েছেন। সে মোতাবেক ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে।

লিজ নিয়ে পুকুর ভরাট করে জায়গা দখলের কথা স্বীকার করেন রাজিবপুর সদর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (তহশিলদার) আব্দুস সালাম মন্ডল। তিনি বলেন, একই দাগে ওসিউজ্জামান ও উপজেলা পরিষদের জমি রয়েছে। ওসিউজ্জামান কোন পাশে মাটি ভরাট করে ঘর তুলছেন তা তাঁর জানা নেই। তবে, কয়েকদিন আগে ওই জায়গায় ঘর নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি ওই ভূমি কর্মকর্তা।

রাজিবপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আকবর হোসেন হিরো বলেন, উপজেলা পরিষদ থেকে ওই পুকুরটি

ওসিউজ্জামানকে ৩বছরের জন্য লিজ দেওয়া হয়েছে। ওসিউজ্জামানের পক্ষে সাফাই গেয়ে এই চেয়ারম্যান বলেন, পুকুরটিতে ওসিউজ্জমানের অংশ রয়েছে।

তবে লিজকৃত ওই পুকুরের ‘উত্তরে সড়ক, দক্ষিণে উপজেলা পরিষদের ২নম্বর সুপার মার্কেট, পূর্বে রাজিবপুর বাজার ও পশ্চিমে শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম’ চৌহর্দ্দি দেওয়া আছে এমন প্রশ্ন করলে চেয়ারম্যান আকবর হোসেন হিরো বলেন, ‘পুকুরটি উপজেলা পরিষদের জমি হলেও ওই সময় ইউএনও-এসিল্যান্ড এমন চৌহর্দ্দি করে দিয়েছেন।’

সরকারি পুকুরে মাটি ভরাট করে ঘর নির্মাণের বিষয়ে জানতে রাজিবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অমিত চক্রবর্ত্তী মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক সাইদুল আরিফ বলেন, বিষয়টি জানার পর ওই জায়গায় নির্মাণসহ সব কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় ভূমি কর্মকর্তাদের মদদে পুকুরটি দখল হয়েছে এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘এমন হয়ে থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *