বান্দরবানে নিহত সেনা সদস্য মাষ্টার ওয়ারেন্ট অফিসার নাজিম উদ্দিনের মরদেহ রংপুরের বাড়ীতে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন সম্পন্ন

বান্দরবানে নিহত সেনা সদস্য মাষ্টার ওয়ারেন্ট অফিসার নাজিম উদ্দিনের মরদেহ রংপুরের বাড়ীতে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন সম্পন্ন

বার্তা সম্পাদকঃএম.মিরু সরকার

কুকি-চিন ন্যাশনাল আর্মির গুলিতে বান্দরবানে নিহত সেনা সদস্য মাষ্টার ওয়ারেন্ট অফিসার নাজিম উদ্দিনের মরদেহ গতকাল মঙ্গলবার বাদ যোহর রংপুর নগরীর ঘাঘটপাড়া এলাকায় নিজ বাড়ীতে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
এ সময় স্ত্রী সন্তান স্বজনের আহাজারীতে ঐ এলাকার পরিবেশ বেদনা বিধুর শোকে ভারী হয়ে ওঠে।

এই মৃত্যু যেন গোটা পরিবারকে দুমরেমুচরে দিয়েছে। তাঁর বাড়ীতে চলছে শোকের মাতম। গত রোববার বান্দরবানের পাহাড়ী এলাকায় পেশাগত দায়িত্ব পালন কালে পাহাড়ী সন্ত্রাসী দল কুকি-চিন ন্যাশনাল আর্মীর গুলিতে নিহত হন মাষ্টার ওয়ারেন্ট অফিসার নাজিম উদ্দিন। আগামী ঈদের ছুটিতে বাড়ী আসার কথা ছিল তাঁর। তবে সন্ত্রাসীদের বুলেট তাঁকে আগাম ছুটিতে বাড়ীতে পাঠালো।

গত ৩০বছর ধরে সেনা বাহিনীতে বিভিন্ন পদ মর্যাদায় নিষ্ঠার সাথে চাকুরী করেছেন নাজিম। তিনি ছিলেন রংপুর নগরীর ঘাঘটপাড়া এলাকার মৃত শমসের আলীর পুত্র। ২ ভাই ৩ বোনের মধ্যে নাজিম সবার বড়। নিহত মাষ্টার ওয়ারেন্ট অফিসার নাজিম উদ্দিনের সাথে তাঁর স্ত্রী চামেলী বেগমের শেষ কথা হয়েছিল গত ১২ই মার্চ শনিবার দুপুরে।

পরদিন দুপুরে স্বামীর মৃত্যুর খবর আসে। বড় সন্তান নায়েমুজ্জামান চঞ্চল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং ছোট ছেলে আব্দুল্লাহ আল নোমান নিরব এবারে এইচএসসি পরীক্ষার্থী। সকলেই শোকে বাকশক্তিহীন হয়ে পড়েছেন।

আজ মঙ্গলবার সকালে নিহত সেনা সদস্য সদ্য পদোন্নতি পাওয়া মাষ্টার ওয়ারেন্ট অফিসার নাজিম উদ্দিনের মরদেহ হেলিকপ্টার যোগে রংপুর সেনানিবাসে আনা হয়। সেখানে আনুষ্ঠানিকতা তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

পরে বেলা পৌনে একটার সময় সেনা বাহিনীর গাড়ীতে তাঁর কফিনবন্দি মরদেহ গ্রামের বাড়ী নগরীর ঘাঘট পাড়ায় নিয়ে আসা হয়। সেখানে ছোট ভাই আজিম মাহমুদ অশ্রুর ধারায় লাশ গ্রহন করে বলে, শনিবার রাতেই ভাইয়ের সাথে শেষ কথা হয় ঈদে বাড়ীতে আসবে বলে।

বাদ যোহর স্থানীয় বাগান বাড়ী মাঠে তাঁর দ্বিতীয় জানাজা নামাজ শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পারিবারিক কবরস্থানে মাষ্টার ওয়ারেন্ট অফিসার নাজিম উদ্দিনের মরদেহ দাফন করা হয়। এ সময় সেনা বাহিনীর ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক লেফটেন্যন্ট কর্ণেল মাহবুব আলম সহ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পদস্থ কর্মকর্তা এবং সদস্যবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য, গণমাধ্যমে প্রকাশিত আইএসপিআর সুত্রে জানাগেছে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে জাতীয় শিশু দিবস ও মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে দুর্গম পাহাড়ী এলাকায় মা ও শিশুদের বিনামূল্যে স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের উদ্দেশে গমনকৃত দলের নিরাপত্তায় নিয়োজিত ছিলেন সেনা সদস্যরা। তাদের ওপর অতর্কিত গুলিবর্ষণ করে কেএনএ সন্ত্রাসীরা।

বিচ্ছিন্নতাবাদী ভাবধারায় বিশ্বাসী কেএনএ নামক সশস্ত্র সন্ত্রাসী দলটি ইতোপূর্বে জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারকিয়া’র মতো একটি জঙ্গি গোষ্ঠীকে বান্দরবানের পাহাড়ী এলাকায় অর্থের বিনিময়ে অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিয়েছে। পাহাড়ী এলাকার অনুগ্রসর জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য বান্দরবানের থানচি সড়ক সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে।

সরকারের এ উন্নয়নমূলক কার্যক্রমকে প্রতিহত করার জন্য কেএনএ সন্ত্রাসী দলটি সড়ক নির্মাণ কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত বেসামরিক ঠিকাদার, মালামাল সরবরাহকারী ও শ্রমিকদের কাছ থেকে প্রথমে চাঁদা দাবি করে।

পরবর্তী সময়ে কাজ বন্ধ করার হুমকি দেয়। কিন্তু সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এ কাজ চলমান থাকায় কেএনএ সন্ত্রাসী দল গত ১১ মার্চ ১২ জন প্রমিককে অপহরণ করে, তাদের মধ্যে একজন শ্রমিক গুলিবিদ্ধ হন এবং চারজন শ্রমিককে এখনও কেএনএ জিম্মি করে রেখেছে। অবশিষ্ট সাতজন শ্রমিককে মুক্তিপণের বিনিময়ে ছেড়ে দিলেও তাদের সেনাবাহিনীর সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের কাজ না করার জন্য হুমকি দেওয়া হয়।

গত রোববার কেএনএ সেনাবাহিনীর টহল দলের ওপর গুলিবর্ষণ করে।উল্লেখ্য, গত ৮ ফেব্রুয়ারী বান্দরবানের তিন উপজেলায় গাড়ী চলাচল বন্ধের জন্য পরিবহন মালিক সমিতিকে হুমকি দিয়ে নোটিশ জারি করে কেএমএ। পরে যেকোনো ধরনের অপ্রত্যাশিত ঘটনা এড়াতে গত রোববার ওই এলাকায় অনির্দিষ্টকালের জন্য ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করে জেলা প্রশাসন এছাড়া কেএনএর নির্যাতনে স্থানীয় বিভিন্ন পাহাড়ী সম্প্রদায়ের অনেক জনগোষ্ঠী ঘর ছেড়ে অন্যত্র বসবাস করছে।

কেএনএ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর চাঁদাবাজি, মাদকের চোরা চালান, অপহরণ ও নৃশংস হত্যাকান্ডের কারণে বর্তমান সরকারের বিবিধ উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড, বে-সরকারি বিনিয়োগ ও পর্যটন শিল্প বাধাগ্রস্থ হচ্ছে।

যার সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। কেএনএর এমন অপতৎপরতা দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার পাশাপাশি বিশ্বদরবারে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্য করছে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বিরাজমান শান্তিশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে বিশ্রিত করছে। মাস্টার ওয়ারেন্ট অফিসার নাজিম উদ্দিন বিগত ৩০ বছর ধরে অত্যন্ত সততা, নিষ্ঠা ও পেশা দারিত্বের সঙ্গে সেনা বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেছেন।

তিনি রংপুর সদরের ঘাঘটপাড়া গ্রামের শমসের আলীর ছেলে। দেশ মাতৃকার সেবায় তার মৃত্যুতে সেনা বাহিনী প্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ গভীর শোক প্রকাশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *